বিজয় দশমী: বাঙালীর শেরা উৎসব দুর্গা পুজো এবং বিজয়া দশমীর পৌরাণিক ব্যাখ্যা
দুর্গা পুজো বাঙালীর সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত একটি উৎসব। এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকও। দুর্গা পুজোর প্রতিটি দিনই বাঙালীদের জীবনে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। পঞ্চমী থেকে দশমী, প্রতিটি দিনই আনন্দ, ভক্তি এবং পরম্পরার মিলিত রূপ। তবে দুর্গা পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হল বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমী মূলত দেবী দুর্গার বিদায় ও শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক, যা একটি নতুন সূচনার পথ প্রশস্ত করে।
এই আর্টিকেলে, বিজয়া দশমীর ইতিহাস, পৌরাণিক দিক এবং এর সাথে জড়িত কিছু ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
দুর্গা পুজোর ইতিহাস ও পটভূমি
দুর্গা পুজো প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রাচীন উৎসবগুলির একটি। এটি প্রথম শুরু হয়েছিল রাজাদের সময়, যখন মন্দিরগুলিতে দেবী দুর্গার পূজা হতো রাজকীয় নিয়মে। দেবী দুর্গা হলেন শক্তির দেবী, যিনি অসুর মহিষাসুরকে পরাজিত করে পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলেন।
মহালয়ার ঐতিহ্য ও পৌরাণিক সম্বন্ধ
দুর্গা পুজোর মূল প্রতিপাদ্য হল দেবী দুর্গার আগমন, এবং মহালয়ার দিন থেকে এই উৎসবের সূচনা হয়। মহালয়ার দিন বাঙালীরা চণ্ডীপাঠ শোনেন, যা আসলে মহিষাসুরমর্দিনী। পুরাণ অনুসারে, এই দিনটি মহিষাসুরকে বধের জন্য দেবী দুর্গার যাত্রা শুরু হয়। এই দিনটিকে বিশেষ করে মনে করা হয় পিতৃপক্ষের শেষ দিন হিসেবে।
বিজয়া দশমী: পুজোর শেষ এবং বিজয়ের মুহূর্ত
বিজয়া দশমী দুর্গা পুজোর চূড়ান্ত দিন। এই দিনটিতে দেবী দুর্গা তার সন্তানদের সাথে কৈলাসে ফিরে যান। এই বিদায়ের মুহূর্তটি একদিকে যেমন আনন্দময়, তেমনই বেদনাদায়ক। আনন্দময়, কারণ দেবী দুর্গার বিজয়ের কাহিনী আবার স্মরণ করা হয়, এবং বেদনাদায়ক, কারণ চার দিনের উৎসবের শেষ মুহূর্তটি আসে।
পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজয়া দশমী
বিজয়া দশমী পৌরাণিক গল্পে একটি বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। পুরাণ অনুসারে, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে দশমীর দিনে পরাজিত করেছিলেন এবং এটি ন্যায়ের প্রতি অন্যায়ের বিজয় হিসাবে উদযাপিত হয়। দশমীর দিন দেবী দুর্গার শক্তির বিজয় পৃথিবীতে স্থাপিত হয়েছিল, এবং সেই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যই প্রতি বছর এই দিনটি উদযাপন করা হয়।
অন্যদিকে, রামায়ণের গল্পে বিজয়া দশমী একটি অন্যরকম তাৎপর্য বহন করে। এই দিনেই রামচন্দ্র রাবণকে পরাজিত করে পৃথিবীতে সত্য এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রতিটি পূজার দিনের ধর্মীয় রীতি ও আচার
দুর্গা পুজোর প্রতিটি দিনই নিজস্ব বিশেষতা এবং ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমী—প্রতিটি দিনেই আলাদা আলাদা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
- ষষ্ঠী: এই দিনেই দেবী দুর্গার বোধন হয়। এটি মূলত দুর্গা পুজোর সূচনার দিন।
- সপ্তমী: এই দিনে নবপত্রিকা স্নান করানো হয় এবং দেবীর পূজার সূচনা হয়।
- অষ্টমী: অষ্টমী হল দেবী দুর্গার মূল পূজার দিন, যেদিন মহিষাসুরকে বধ করার জন্য দেবীর শক্তির পূজা করা হয়।
- নবমী: নবমী দিনে দেবী দুর্গার বিজয় উদযাপন করা হয়।
- দশমী: এই দিনেই দেবী দুর্গার বিসর্জন দেওয়া হয়। এই দিনটি বিদায় এবং মিষ্টি বিনিময়ের দিন।
বিজয়া দশমীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক
বিজয়া দশমী কেবল ধর্মীয় পর্ব নয়, এটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উৎসবও। এই দিনটিতে মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান, মিষ্টি বিনিময় করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেন। দেবী দুর্গার বিসর্জনের পরে সকলের মধ্যে এক আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বড়দের প্রণাম করে এবং সমবয়সীদের আলিঙ্গন করে এই দিনটিতে সম্পর্কগুলিকে আরও দৃঢ় করার একটি প্রচেষ্টা করা হয়।
দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন: বিজয়া দশমীর দিনে, দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার একটি পুরাতন প্রথা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেবীকে তার স্বর্গীয় বাসস্থানে পাঠানো হয়। বিসর্জনের সময়কার দৃশ্য, ধূপের গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ, এবং জলাশয়ে প্রতিমার ডুব, সব মিলিয়ে এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত তৈরি করে।
বিজয়া দশমীর সাম্প্রতিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক উদযাপন
বিজয়া দশমীর প্রভাব এখন শুধুমাত্র বাঙালী সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের দিনে, এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদযাপিত হয়। প্রবাসী বাঙালিরা যেখানেই থাকুন না কেন, তারা দুর্গা পুজো এবং বিজয়া দশমী উদযাপন করেন। কলকাতা, দিল্লি বা মুম্বাইয়ের পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, সিঙ্গাপুরের মতো বড় শহরগুলোতেও এখন দুর্গা পুজো আয়োজন করা হয় এবং প্রবাসীরা এখানেও বিজয়া দশমীর ঐতিহ্য মেনে উদযাপন করেন।
উপসংহার
বিজয়া দশমী বাঙালীর জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বন্ধনও। বিজয়া দশমী আমাদেরকে এক নতুন সূচনার আশা দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষণা করে। আজকের দিনে, যখন আমরা এই ঐতিহ্য উদযাপন করি, তখন আমরা পুরাণের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করি এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

No comments:
Post a Comment